টিনটিনের লেখক হার্জ এর জীবনী (Tintin's writer Herge biography bangla)

herge_tintin_bangla
Picture source : tv5monde.com

টিনটিনের লেখক হার্জ

আমাদের প্রিয় কার্টুনিস্ট যিনি আমাদের টিনটিন, ক্যাপ্টেন হ্যাডক এবং প্রফেসর ক্যালকুলাসের মতো চরিত্র উপহার দিয়েছেন। যার কমিকস বইগুলি সব স্তরের পাঠকদের জন্য সেরা উপহার ছিল। সেই জর্জেস রেমি ওরফে হার্জের জন্ম ২২ মে, ১৯০৭, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস, একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার বাবা অ্যালেক্সিস রেমি একটি মিষ্টান্ন কারখানায় কাজ করতেন এবং তার মা এলিজাবেথ ডুফোর ছিলেন একজন গৃহিণী।


হার্জ এর শৈশব

শৈশবে তিনি ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন এবং কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। ছোট বয়স থেকেই তার সিনেমার প্রতি টান ছিল। চার্লি চ্যাপলিন সহ অন্যান্য কমিক অভিনেতাদের চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করতেন। পরবর্তীতে কমিক স্ট্রিপ নিয়ে তার কাজে এটির একটি সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার স্কুলে পড়াশুনা শুরু হয়েছিল।

রেমি একজন সফল ছাত্র হিসেবে স্কুলে পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ১৯২৫ সালে সেকেন্ডারী এক্সাম সম্পন্ন করেন ক্লাসের শীর্ষে থেকে।

তিনি তার স্কুলের বইয়ে দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যগুলি আঁকতেন। এই চিত্রগুলির মধ্যে কিছু জার্মান সৈন্যদের উল্লেখ ছিল, কারণ তার চার বছরের প্রাথমিক শিক্ষার সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটেছিলো। সে সময় ব্রাসেলস জার্মান সেনাবাহিনীর দখলে ছিল।


দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ টোটর

তার স্বতন্ত্র চিত্রের পাশাপাশি, ১৯২৬ সালের জুলাইয়ে হার্জ লে বয়-স্কাউট বেলজের জন্য একটি কমিক স্ট্রিপ শুরু করেন, লে অ্যাভেঞ্চারস ডি টোটর (দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ টোটর)। যেটির ১৯২৯ সাল পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত ছিল।

১৯২৫ সালে স্নাতক হওয়ার পর হার্জ "ইকোল সেন্ট লুক আর্ট" স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু বিরক্তিকর মনে হওয়ায় তিনি তা ছেড়ে দেন। তিনি একজন চিত্রকর হিসেবে একটি নিউজপেপার ডিপার্টমেন্টে কাজ শুরু করেন। এর সাথে সাথে তিনি টোটারের এপিসোডগুলির স্কেচিং এর নির্মাণ অব্যাহত রেখেছিলেন।


রিপোর্টার এবং কার্টুনিস্ট

১৯২৭ সালের আগস্টে, হার্জ "লে ভিংটিম সিকল" এর সম্পাদক, অ্যাবে নরবার্ট ওয়ালেজের সাথে দেখা করেন। যিনি তার ডেস্কে ইতালীয় ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনির স্বাক্ষরিত ছবি রাখতেন। হার্জের কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, ওয়ালেজ তাকে কাগজের দপ্তরে ফটোগ্রাফিক রিপোর্টার এবং কার্টুনিস্ট হিসাবে একটি কাজ দিতে রাজি হন। সেকারণে হার্জ তার প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন।

১৯২৮ সালের শেষের দিকে ওয়ালেজ শিশুদের জন্য সংবাদপত্রের একটি সিরিজ শুরু করেন, যা প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হতো। কিন্তু এটি শক্তিশালী ক্যাথলিক এবং ফ্যাসিস্ট বার্তা বহন করতো। এর অনেক অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ইহুদি বিরোধী ছিল। এই নতুন উদ্যোগে হার্জ চিত্র অঙ্কন করলেও অসন্তুষ্ট ছিলেন। কারণ তিনি নিজের মস্তিস্ক প্রসূত একটি কমিক স্ট্রিপ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন।


টিনটিন

এরপর হার্জ তার জীবনের সেরা কীর্তি কার্টুন চরিত্র "এডভেঞ্চার অফ টিনটিন" (Adventures of Tintin) তৈরি করেন। যে তার কুকুর স্নোয়ের সাথে বিশ্ব ভ্রমণ করতে পারে। হার্জের তৈরী টোটারের চরিত্র এবং তার নিজের ভাই পলের চরিত্রের উপর ভিত্তি করে তিনি টিনটিন কে তৈরী করেছিলেন বলে জানা যায়। 

এদিকে রিপোর্টার ডিগ্রেল মিথ্যাভাবে দাবি করেন যে টিনটিন তার (রিপোর্টার ডিগ্রেল) উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। তাই ডিগ্রেল অনুমতি ছাড়াই হার্জ এর একটি ডিজাইন ব্যবহার করলে ঝামেলা আদালত অবধি গড়ায় ও নিস্পত্তি হয়। পরবর্তী পাঁচ দশকে টিনটিন জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্রগুলির মধ্যে একটি হয়ে ওঠে।

১৯৩২ সালে হার্জ বিয়ে করলেন কিকেন্স কে। যিনি ছিলেন "লে ভিংটিম সিকল" পত্রিকার পরিচালকের সেক্রেটারি।


আরো কিছু কথা


বেনারসি শাড়ির ইতিহাস ও বর্তমান


পান্নালাল ভট্টাচার্য্য র অকাল মৃত্যু ও অজানা তথ্য


গ্রামোফোন রেকর্ডে কুকুরের ছবির ইতিহাস


হেলেন মানেই অসাধারণ নাচ


রেলের টাইম কিপার থেকে সুপারস্টার কে এল সায়গল


পথের পাঁচালীর ইন্দির ঠাকুরণ সম্পর্কে অজানা তথ্য



দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও টিনটিন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা বেলজিয়াম দখল করে নেয়। তারা সমস্ত পত্রিকা বন্ধ করে দেয়। একমাত্র তাদের নিজস্ব পত্রিকা "লু সৈর" চালু রাখে। হার্জ এই পত্রিকায় কাজের সুযোগ পান। তিনি আবার নতুন করে টিনটিন কে প্রকাশ করতে থাকেন।

নতুন নতুন গল্প সবার মন জয় করে নেয়। এখানে তিনি খুব সতর্ক হয়ে কাজ করতেন, কেননা বর্তমান পরিস্থিতি যাতে কোনভাবেই টিনের গল্পে প্রকাশ না পায় সে ব্যাপারে সচেতন থাকতেন।


টিনটিন "পত্রিকার" প্রকাশ

যুদ্ধ শেষ হলে হার্জ অভিযুক্ত হলেন নাৎসি বাহিনীকে সাপোর্ট করার জন্য। অবশ্য তিনি এই দোষ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু এই কলঙ্ক তাকে বহুদিন বয়ে বেড়াতে হয়েছিল।

১৯৪৬ সালে প্রকাশ করলেন টিনটিনের পত্রিকা। প্রকাশের পরই ব্যাপক হারে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলো। অবশেষে দর্শকদের চাপে নিজস্ব স্টুডিও স্থাপন করলেন। সেখানে আরও বৃহৎ আকারে টিনটিনের কাজ শুরু হলো।


ব্যক্তিগত জীবন

হার্জ শহরের বাইরে হাঁটতে, বাগান করতে এবং আঁকা সংগ্রহ করতে ভালোবাসতেন। তিনি জ্যাজ সঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন।  তিনি প্রকাশ্যে বা প্রেসে উপস্থিত হওয়া অপছন্দ করতেন। তার কাছে আসা সমস্ত অনুরাগীদের মেইলের জবাব দিতে পছন্দ করতেন। 

"তিনি বলেছিলেন যে শিশুদের চিঠির উত্তর না দেওয়া তাদের স্বপ্নের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার সমান।" সহকর্মীরা হার্জকে অহংকেন্দ্রিক মনে করতেন এবং এই মূল্যায়নটির সাথে তিনি একমত ছিলেন। প্রথম বিবাহের আগে বিভিন্ন মহিলার সাথে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। 


সংকটময় মুহুর্ত

১৯৬০ সালের পর থেকে তার জীবনে সংকটময় পরিস্থিতি উপস্থিত হয়। স্ত্রী র থেকে আলাদা হয়ে যান। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হার্জ কে মনোবিদ পরামর্শ দেন টিনটিন না লেখার জন্য। তবুও তিনি টিনটিনের থেকে দূরে থাকতে পারলেন না। প্রকাশ করলেন "তিব্বতে টিনটিন"। এ সময় তিনি তার স্টুডিওর এক শিল্পী ফ্যানি ভ্লামিঙ্কের প্রেমে পড়েন।


জীবনের সমাপ্তি

১৯৮৩ সালে ৭৫ বছর বয়সে টিনের স্রষ্টার জীবনের সমাপ্তি হলো। তার ইচ্ছা ছিল তার মৃত্যুর সাথে সাথে টিনটিনেরও মৃত্যু হবে। সেই ইচ্ছে পূরণ করলেন তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। ১৯৮৭ সালে বন্ধ হল হার্জ স্টুডিও। তৈরি হলো হার্জ ফাউন্ডেশন। সমস্ত কপিরাইট রাখলেন নিজেদের হাতে। পরবর্তী সময়ে কেউ টিনটিন কে নিয়ে গল্প লিখতে পারেননি। এরপর ১৯৮৮ তে টিনটিন ম্যাগাজিন টিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হার্জ চলে গেছেন, কিন্তু টিনটিনের মাধ্যমে তিনি আজও জীবিত। আজও রোমাঞ্চকর টিনটিনের প্রতিটা গল্পের প্রতিটা অক্ষরে তিনি স্বমহিমায় বিচরণ করছেন।


আজকের লেখা টিনটিনের লেখক হার্জ এর জীবনী (Tintin's writer Herge biography bangla) ভাল লাগলে কমেন্টে জানাতে পারেন। আমাদের মন জংশন ইউটিউব চ্যানেলে ঘুরে আসতে পারেন আরো পুরাতনী তথ্য জানার জন্য, ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ