ভারতের বিখ্যাত শিল্পকর্ম মধুবনী চিত্রকলা (Famous artwork of India Madhubani Chitrakala in bangla)

ভারতের_বিখ্যাত_শিল্পকর্ম_মধুবনী_চিত্রকলা
Picture source : flickr.com


মধুবনী চিত্রকলা

মধুবনী চিত্রকলা বিখ্যাত ভারতীয় শিল্পকলার একটি নিদর্শন। এই চিত্রগুলি উত্সব, ধর্মীয় আচার সহ বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য পরিচিত।

আপনার জেনে ভালো লাগবে যে মধুবনী চিত্রগুলিতে ব্যবহৃত রঙগুলি সাধারণত গাছপালা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উত্স থেকে উদ্ভূত হয়। ব্রাশের পরিবর্তে, পেইন্টিংগুলি তৈরি করতে গাছের ডাল, দেশলাই কাঠি এমনকি আঙ্গুলের ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

মানুষের ভাবনা প্রকাশের একটি মাধ্যম চিত্রকলা। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে, এই শিল্পের আবির্ভাব ঘটে যখন হোমো স্যাপিয়েনরা মাটির উপর গাছের ডাল, আঙুল বা হাড়ের মাধ্যমে ছবি আঁকত। এরপর থেকে ধীরে ধীরে অঙ্কন শিল্পকলার অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি মানুষের জীবনে লক্ষ করা যায়। যার মধ্যে মধুবনী শিল্পকলা একটি বিখ্যাত নাম।


উৎপত্তি ও ইতিহাস

১৯৩৪ সালে বিহারের মধুবনী জেলার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা উইলিয়াম জি আর্চার মধুবনী চিত্রকলার আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি বাড়ির ভিতরের দেয়ালে এই চিত্রগুলি দেখে অভিবুত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও উন্নত মানের মধুবনী চিত্রগুলির একটি ভাণ্ডার স্থাপন করেছিলেন।

মধুবনী চিত্রকলার উৎপত্তি বিহারের মিথিলা অঞ্চলে। মধুবনী চিত্রকলার কিছু উল্লেখ হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণে পাওয়া যায়। রাজা জনক (সীতার পিতা) তার চিত্রশিল্পীদেরকে তার মেয়ের বিয়ের জন্য মধুবনী চিত্রকর্ম তৈরি করতে বলেছিলেন।

মনে করা হয় সেই শিল্প কলার জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্থানান্তরিত হয়েছে। ঘর সাজানোর উদ্দেশ্যে গ্রামের মহিলারাও বাড়ির দেয়ালে এই ছবি আঁকার চর্চা করতেন। তাদের চিত্রগুলি প্রায়শই তাদের চিন্তা, আশা, জীবন দর্শন এবং স্বপ্নকে প্রতিফলিত করতো।

সময়ের সাথে সাথে, মধুবনী পেইন্টিংগুলি উত্সব এবং বিবাহের মতো বিশেষ অনুষ্ঠানগুলির একটি অংশ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে, এই শিল্পটি শিল্পের অনুরাগীদের আকৃষ্ট করেছিল। এর প্রভাবে মাটির দেয়ালে আঁকা মধুবনী চিত্র শিল্প ক্রমে কাগজ বা কাপড়ের মাধ্যমে অঙ্কিত হতে থাকে।  


স্টাইল এবং ডিজাইন

ঐতিহ্যগতভাবে এই চিত্রগুলি ব্রাহ্মণ ও কায়স্থ মহিলারা করতেন। ১৯৭০ এর পর থেকে শিল্প ব্যবসায়ীদের আগমন এবং জাতীয় স্বীকৃতি গ্রামবাসীদের আয়ের নতুন উত্স দিয়েছিল। আরও গবেষণায় জানা গেছে যে হরিজন মহিলারাও তাদের কুঁড়েঘরের দেয়ালগুলি এই চিত্র দিয়ে সাজাতেন।

মধুবনী পেইন্টিংগুলি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা অনুশীলন করেছেন। তাই চিত্রগুলিকে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন শৈলীতে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যেমন তান্ত্রিক, কোহবার, ভরনি, গোরনা ও কাচনি।

তবে বর্তমানে এই পাঁচটি ভিন্ন শৈলীগুলিকে একত্রে সমসাময়িক শিল্পীরা একটি নির্দিষ্ট রূপ দিয়েছেন। এই পেইন্টিংগুলিতে ব্যবহৃত বিষয়বস্তূ প্রায়শই হিন্দু দেব দেবীদের নিয়ে অঙ্কিত হয়ে থাকে। 

এছাড়াও প্রকৃতি, সূর্য, চাঁদের মতো বিষয় গুলিও মধুবনী চিত্রগুলির অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। রাজকীয় দরবার বা বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানের দৃশ্যের উপর ভিত্তি করেও পেইন্টিং গুলি তৈরী করা হয়েছে। এই ধরণের পেইন্টিংগুলিতে জ্যামিতিক নিদর্শনও বেশ স্পষ্ট।


আরো কিছু কথা


বেনারসি শাড়ির ইতিহাস ও বর্তমান


পান্নালাল ভট্টাচার্য্য র অকাল মৃত্যু ও অজানা তথ্য


গ্রামোফোন রেকর্ডে কুকুরের ছবির ইতিহাস


হেলেন মানেই অসাধারণ নাচ


রেলের টাইম কিপার থেকে সুপারস্টার কে এল সায়গল


পথের পাঁচালীর ইন্দির ঠাকুরণ সম্পর্কে অজানা তথ্য


উপকরণ

এই অঙ্কনশৈলীতে ব্যবহৃত ব্রাশ এবং রঙগুলি প্রায়শই প্রাকৃতিক উত্স থেকে নেওয়া হয়। গুঁড়ো চাল, কাঁচা হলুদ, পরাগ, রঙ্গক, নীল, বিভিন্ন ফুল, চন্দন, এবং বিভিন্ন গাছপালা ও গাছের পাতা ইত্যাদি ব্যবহার করে চিত্রগুলি তৈরি করা হয়। এছাড়াও, অনেক প্রাকৃতিক বস্তু একত্রিত করা হয় শিল্পটির পূর্ণতার জন্য।

এতে ব্যবহৃত রঙগুলি প্রায়শই শিল্পীরা নিজেরাই প্রস্তুত করে থাকেন। চিত্রকর্ম গুলিকে আরো বেশি করে প্রাকৃতিক রূপ দেওয়ার জন্য শিল্পীরা আঁকা শেষ করার পরেও খালি জায়গা থাকলে ফুল, পশু, পাখি ইত্যাদির নিদর্শন আঁকার মাধ্যমে সেই খালি স্থানগুলি পূরণ করেন। অঙ্কনের সীমানা বরাবর দুটি লাইন আঁকা হয়।

শিল্পটিতে কাদা এবং গোবরের পাতলা স্তর ব্যবহার করা হয়। যা সংরক্ষণকারী বস্তু, শুভ এবং সমৃদ্ধির চিহ্ন হিসাবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও আঙুল, বাঁশের ডাল, তুলো এবং আজকাল কলম ব্যবহার করে চিত্র তৈরি করা হয়।


বিষয় 

পেইন্টিংগুলির থিমগুলি বিভিন্ন ইভেন্টের উপর নির্ভর করে আঁকা হয়। যেমন, ভালবাসা, বিবাহ, হিন্দু ধর্মালম্বীদের সমস্ত দেবতা, গ্রামীণ ঐতিহ্য ইত্যাদি এই শিল্পে পাওয়া যাবে।

উল্লেখযোগ্য পছন্দের বিষয় গুলির মধ্যে মাছ এবং অন্যান্য শুভ চিহ্ন দ্বারা পরিবেষ্টিত নববধূ, বিবাহের মুকুট পরা বর, শিকার এবং কৃষকের লাঙ্গল দেওয়ার দৃশ্য, গাছ, প্রাণী ইত্যাদি জনপ্রিয়।


বর্তমান পরিস্থিতি 

মধুবনী শিল্প বর্তমান বিহারের রান্টি নামক একটি গ্রামের মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যে মহিলারা গ্রামে এই শিল্পের চর্চা করেন তারা যেমন সামাজিক সচেতনতা তৈরি করছেন তেমনই নারীর ক্ষমতায়নের সুযোগ করে দিচ্ছেন।

মধুবনী শিল্পের বিশেষ কিছু  কাজ জাপানের একটি জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়াও, মিথিলার কাছাকাছি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো তরুণ শিল্পীদের মধুবনী পেইন্টিং শেখায়। এভাবে এই শিল্পের প্রসার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে।


আজকের লেখাটি (ভারতের বিখ্যাত শিল্পকর্ম মধুবনী চিত্রকলা, Famous artwork of India Madhubani Chitrakala in bangla) ভাল লাগলে কমেন্টে জানাতে পারেন। আমাদের মন জংশন ইউটিউব চ্যানেলে ঘুরে আসতে পারেন আরো পুরাতনী তথ্য জানার জন্য, ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ