বেনারসি শাড়ির অবাক করা ইতিহাস এবং বর্তমান পরিস্থিতি

বেনারসি_শাড়ির_অবাক_করা_ইতিহাস
Picture source : flikr.com




বেনারসি শাড়ির অবাক করা ইতিহাস

পৃথিবীতে যে কয়েকটা জাতিগোষ্ঠী তাদের হাজার বছরের প্রাচীন পোশাকের ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে, তাদের মধ্যে বাঙালিরা উল্লেখযোগ্য।

আর এই প্রাচীন পোশাকের ঐতিহ্য ধারাকে যে পোশাক গুলি এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে তাদের মধ্যে অন্যতম বেনারসি শাড়ি। নিপুন বুনন কৌশল এবং অনবদ্য সৃষ্টিশীল কারিগরি এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

ভারতের বেনারস থেকে এই শাড়ির উৎপত্তি হয় বলেই এই শাড়ির নাম বেনারসি রাখা হয়।

এই শাড়ি মানবচালিত যন্ত্র তাঁতের সাহায্যে তৈরি করা হয়। আর এর কারিগরদের বলা হয় তাঁতী।


ইতিহাস

আর্য সমাজে বস্ত্র বুননের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা তন্তুবায় নামে পরিচিত ছিলেন। ঋগ্বেদের সময়ে হিরন্ময় বস্ত্র এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সোনার সুতা মিশিয়ে বোনা হতো সেই কাপড়।

জানা যায়, এই তন্তুবায় সম্প্রদায় সিন্ধু নদের তীর থেকে ক্রমে গঙ্গার তীরবর্তী বিভিন্ন জনপদে তাদের ঘর বাঁধে। বেনারসে এদের সংখ্যা বেশী দেখা যায়।

ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে গুজরাট থেকে বহু তাঁতি বেনারসে চলে যায়। তারা তা শিল্পের ধারাকে বয়ে নিয়ে যেতে সুবিধা করে দেন। এদের প্রত্যেকের সৌজন্যে বিশ্বব্যাপী বেনারসি শাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।


মুঘলদের অবদান

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এ বেনারসের বস্ত্রবয়ন শিল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও আজও স্বমহিমায় বিরাজমান বেনারসি শাড়ি। এই শাড়ির মানোন্নয়নে মুঘলদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা এই শিল্পে পারস্যের নকশা সংযোজন করে। কল্কা পার এর অন্যতম উদাহরণ।



আরো কিছু কথা



পান্নালাল ভট্টাচার্য্য র অকাল মৃত্যু ও অজানা তথ্য


গ্রামোফোন রেকর্ডে কুকুরের ছবির ইতিহাস


হেলেন মানেই অসাধারণ নাচ


রেলের টাইম কিপার থেকে সুপারস্টার কে এল সায়গল


পথের পাঁচালীর ইন্দির ঠাকুরণ সম্পর্কে অজানা তথ্য



বাঙালি

এছাড়াও বেনারসি শাড়ি শিল্পে কিছু কিছু বাঙালিও যোগ দেন। স্বাধীনতার পরে বাঙালিদের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। আদি বেনারস এবং এর আশপাশের যেসব এলাকা বেনারসি শাড়ি বোনার জন্য বিখ্যাত, যেমন ঝিয় মদনপুরা, কাশি, বড়িবাজার, সোনারপুরা, চৌকাঘাট পানিট্যাঙ্কি ইত্যাদি।


বেনারশী শাড়ি তৈরির পদ্ধতি

বেনারশী শাড়ি তৈরি করা হয় মানবচালিত যন্ত্র তাঁতের মাধ্যমে। এই শাড়ি তৈরির মূল উপাদান কাঁচা রেশম সুতা। এর পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় জরি সুতা। বর্তমানে দেশী রেশম সুতার দাম বৃদ্ধির কারণে তাঁতীরা সস্তা চায়না সিল্ক সুতা ব্যবহার করে থাকেন।

বিদেশ থেকে আনা সুতা কারিগরেরা প্রথমে রং করেন। তারপর সাবান ও গরম জলে ধুয়ে রৌদ্রে শুকান। এরপর চলে তাঁতে নান্দনিক বুননের কাজ। ডিজাইন ও বুনন সহজ হলে একটি শাড়ি তৈরি করতে একজন তাঁতির সময় লাগে প্রায় এক সপ্তাহ।


নিখুঁত বুনন

আবার কঠিন ডিজাইন ও নিখুঁত বুননের কাজ করতে তিনজন তাঁতির তিন মাস সময়ও লেগে যায়! একটি শাড়ি তৈরির হওয়ার পর তা পলিশ করা হয়।

বেনারশী শাড়ির রঙের বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। বিভিন্ন রঙের ওপর জমকালো সোনালি-রূপালি জরির কাজ দৃষ্টিনন্দন লাগে । বেনারশী শাড়ির ধরন বা ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে রাখা হয় শাড়ির বিভিন্ন নাম।


সুতার কাজ

বেনারসি শাড়ি সব সময়েই সিল্ক সুতায় বোনা হয়ে আসছে। তবে বুননে জমিন অলংকরণের জন্য রুপা ও সোনার জরি ও মিনা করার জন্য অন্য সুতা বা জরি ব্যবহার করা হয়েছে। মার্সেরাইজড কটন বা গ্যাস সিল্ক সুতা ও সিল্ক সুতা ব্লেন্ড করেও উন্নত মানের বেনারসি বোনা হয়।


নাম

ডিজাইন ও সুতা অনুযায়ী বেনারসি শাড়ির বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়ে থাকে, যেমন—জংলা, বেল স্যাটিন, কাড়িয়াল, জামেবার, স্বর্ণকাতান, চান্দেরি, অরগাঞ্জা কাতান, পাটোলা, জুট কাতান ইত্যাদি।


বর্তমান অবস্থা

একসময় রমরমা অবশ্যই ছিল; কিন্তু এখন সেদিন নেই। তাঁত আছে, কারিগর নেই। অনেক দক্ষ তাঁতিই অন্য পেশায় চলে গেছেন। সেদিনের ম্যানুয়াল তাঁত শিল্পের প্রচলন কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক যন্ত্র। অনেক তাড়াতাড়ি এবং প্রচুর পরিমাণে বেনারসি শাড়ির উৎপাদন হলেও, দীর্ঘ সময় ধরে যত্ন নিয়ে বেনারসির বুনন আজ অপ্রতুল।


আজকের লেখা টি ভাল লাগলে কমেন্টে জানাতে পারেন। এছাড়াও আমাদের ইউটিউব চ্যানেল মন জংশন এ ঘুরে আসতে পারেন আরো পুরাতনী তথ্য জানার জন্য, ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ