পথের পাঁচালির ইন্দির ঠাকুরন (চুনিবালা দেবী) সম্পর্কে অবাক করা তথ্য

Pather panchali chulibala devi
Picture source ? Get Bengal 


পথের পাঁচালির ইন্দির ঠাকুরন


সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়ে গিয়েছে যে ছায়াছবি পথের পাঁচালিতে কোন মেকআপ এর ব্যবস্থা নেই অর্থাৎ মেকআপ ছাড়াই শুটিং হবে। অথচ ইন্দির ঠাকুরণের চরিত্রে অভিনয় করার মতন তেমন কোনো বৃদ্ধাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

এমতাবস্থায় কি করা যায় সে নিয়ে যথেষ্ট ভাবনায় পড়ে যান পরিচালক সত্যজিৎ রায়। যেহেতু মেকআপের কোন ব্যবস্থা নেই তাই কোন অল্প বয়সী মহিলাকে বৃদ্ধা সাজিয়ে অভিনয় করানোও সম্ভব নয়।

ভাবুন একবার কি জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল সিনেমাটির শুটিং শুরুর আগে। কিন্তু কীভাবে এই এত বড় সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল? কিভাবে সেই কালজয়ী সিনেমা তৈরি হলো তৈরি হলো হলো? আজকে সেই ঘটনা তুলে ধরবো এই ছোট্ট প্রয়াসে।


অভিনেত্রীর সন্ধানে :


"পচাত্তর বৎসরের বৃদ্ধা, গাল তোবড়াইয়া গিয়াছে, মাজা ঈষৎ ভাঙিয়া শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে। দূরের জিনিস আগের মতো ঠাহর হয় না”। সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায় ইন্দির ঠাকরুন এর ব্যাপারে এমনই উল্লেখ ছিল। 

তাই সমস্ত চরিত্র যেমন অপু, দুর্গা, প্রসন্ন ইত্যাদি সবার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অভিনেতা এবং অভিনেত্রী পাওয়া গেলেও এই একটি মাত্র চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সঠিক মানুষের ভীষন অমিল দেখা দিয়েছিল। 

যখন আর কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না এমন চরিত্রের হদিস পাওয়া। তখন একটি খবর মিললো নিভাননী দেবীর বাড়ি, পাইকপাড়ায় এক বৃদ্ধার। সত্যজিৎ বাবুর সাথে দেখা হল চুনিবালা দেবীর অর্থাৎ সেই বৃদ্ধার। 

একেবারেই যেমনটি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের রচনায় উল্লেখ ছিল ঠিক তেমনি চরিত্রের এবং চেহারার মানুষ ছিলেন এই চুনিবালা দেবী। যিনি পরবর্তীতে এই অসাধারণ চরিত্র অর্থাৎ ইন্দির ঠাকুরণের ভূমিকায় অভিনয় করে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।


যখন পাওয়া গেল তাঁকে :


তবে চেহারা মিললেও স্বাস্থ্য সম্পর্কে যথেষ্ঠ সন্দেহ ছিল সত্যজিৎ রায়ের। বৃদ্ধা এই বয়সে এত বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারবেন? স্ক্রিপ্ট মুখস্ত রেখে অভিনয় এবং সমস্ত দিন অপেক্ষা করে অভিনয় করা এই বয়সে কি সম্ভব হবে? 

তবে সব সন্দেহর অবসান করেছিলেন বৃদ্ধা চুনি বালা দেবী। তিনি পরিচালক সত্যজিৎ বাবুকে একটি বড় লেখা ছড়া সম্পূর্ণ মুখস্থ শুনিয়ে অবাক করেছিলেন। আর বাড়ি থেকে প্রায় 15 মাইল দূরে শুটিংয়ের স্থলে গিয়ে শুটিং করার জন্য যথেষ্টভাবে সক্রিয় ছিলেন। 

তাই সবদিক থেকেই তিনি এই পরীক্ষায় উতরে গেছিলেন। তাই আর তাকে অভিনয়ে নেওয়ার জন্য কোন দ্বিধা কাজ করেনি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের মনে।





বৃদ্ধার কর্মদক্ষতা :


চুনিবালা দেবী এই ছায়াছবিতে অভিনয়ের অনেক আগে দুটি নির্বাক ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। তাই তার সুপ্ত প্রতিভা ধীরে ধীরে আবার উন্মোচিত হয়েছিল এবং সত্যজিৎ রায় কে অবাক করে দিয়েছিল। সত্যজিৎ রায় আবিষ্কার করেছিলেন যে বৃদ্ধা গান গাইতে পারেন এবং তার অভিনয় ক্ষমতা অসম্ভব ভাল। 

তিনি ছিলেন যথেষ্ট খুঁতখুঁতে এবং পরিপাটি অভিনয়ের জন্য ভীষণ উৎসাহী। এই ছবিতে ইন্দির ঠাকুরণের শবযাত্রার আবহ সংগীত "হরি দিন তো গেল" চুনিবালা দেবীর নির্বাচন ছিল।


সেই বিখ্যাত দৃশ্য : 


এবার আসি সেই মারা যাওয়ার বিখ্যাত দৃশ্যের কথায়। চুনিবালা দেবীকে ঠাট্টা করে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন "আজকে আপনাকে খাটে চড়াবো"। খুব সাবলীলভাবে চুনিবালা দেবী তাতে সায় দিয়েছিলেন।

এই অভিনয় দৃশ্যটি নিয়ে মানিকবাবু যথেষ্ট চিন্তায় ছিলেন। অভিনয়টি যথেষ্ট পাকাপোক্ত না হলে দৃশ্যটির রং পুরো বদলে যাবে। ছেলেমানুষী মনে হবে বিষয়টি। কিন্তু অনবদ্য অভিনয় দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বৃদ্ধা। 

শুটিং হয়ে যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ বৃদ্ধা একইভাবে মরার মতন ভঙ্গিতে শুয়ে ছিলেন। তারপর উঠে বলেন "শুটিং শেষ? আমি তো জানতে পারিনি। কেউ তো আমায় জানায়নি"।


তিনি চলে গেলেন :


সবচেয়ে দুঃখের বিষয় 1955 সালে যখন পথের পাঁচালী প্রকাশ পায় তখন চুনিবালা দেবী ইহজগতে ছিলেন না। এক কঠিন জ্বরে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তার নিজের সৃষ্টি, নিজের কর্ম দক্ষতা যে কিভাবে বিশ্বের দরবারে সম্মানিত হয়েছিল তা দেখার সুযোগ হয়ে উঠলো না তার নিজেরই। 

তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান পেয়েছিলেন। ম্যানিলা চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি এই পুরস্কার পান।


অভিনয় পারদর্শীতা :


এমনই অভিনয় পারদর্শিতায় চুনিবালা দেবী মুগ্ধ করেছিলেন সত্যজিৎ রায় কে, ছায়াছবির অন্যান্য কলাকুশলীদের এমনকি সমস্ত দর্শকদের। জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে চুনিবালা দেবী তথা ইন্দির ঠাকুরণ আমাদের মনের মনিকোঠায় সারাজীবন জায়গা করে নিয়েছেন এভাবেই।


আপনার জন্য :


আপনার কি মনে হয় চুনীবালা দেবী চরিত্রটির জন্য যথার্থ ছিলেন? আপনার উত্তর চটপট লিখে জানান কমেন্ট বক্সে। আপনার উত্তরের আশায় অপেক্ষায় রইলাম।

আর এই ধরনের নস্টালজিক ও সত্য ঘটনা সম্পর্কে জানতে পুরাতনীর সঙ্গে থাকুন।

এছাড়াও আমাদের ইউটিউব চ্যানেল মন জংশন এ ঘুরে আসতে পারেন আরো পুরাতনী তথ্য জানার জন্য, ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ