শ্যামাসংগীত শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্যের অকাল মৃত্যু এবং অজানা কিছু তথ্য

শ্যামাসংগীত_শিল্পী_পান্নালাল_ভট্টাচার্য
Picture source : discogs.com




শ্যামাসংগীত শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য


তার গান শুনে মনে হতো মাতৃস্বাধক স্বয়ং রামপ্রসাদ সেন গাইছেন। যেন তিনি গায়ক নন একজন বড় মাপের মাতৃ সাধক ছিলেন। তার প্রতিটা গান যেন মায়ের প্রতি তাকে আহ্বান জানানোর ছল।

আজও শ্যামা মায়ের পুজো তার গান ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এহেন প্রতিভাবান শ্যামা সংগীত শিল্পীর জীবন কেমন ছিল। কিভাবে তিনি এতো বড় মাপের সংগীত শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। আর কেনই বা তিনি অকালে সেচ্ছায় মৃত্যু বরণ করলেন?



প্লেব্যাক সিঙ্গার হওয়ার ইচ্ছা

তার ইচ্ছা ছিল তিনি একজন প্লেব্যাক সিঙ্গার হবেন এবং আধুনিক গান গাইবেন। কিন্তু সে স্বপ্ন তার স্বপ্নই রয়ে গেল। দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের হাত ধরে মেগাফোন কোম্পানিতে সুযোগ পেলেন শ্যামা সংগীত গাওয়ার জন্য। আর তাতেই মাতৃ সঙ্গীত সাধনার জোয়ার বয়ে গেল তাঁর মনে। 

মনে হতো কোন মাতৃ সাধক গানগুলো গেয়েছেন। অগনিত শ্রোতা তার গানে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এরপরে আর তাকে তার কাজ নিয়ে ভাবতে হয়নি। একের পর এক শ্যামাসঙ্গীতের রেকর্ড তিনি তৈরি করেছেন আর অগণিত শ্রোতাদের শ্যামা সঙ্গীত উপহার দিয়েছেন। 

প্লেব্যাক সিঙ্গার হওয়ার ইচ্ছা না মিটলেও তিনি পেলেন কালি সাধনার সুযোগ। মা যেন তাঁর কণ্ঠে বিরাজ করতেন। প্রত্যেকটি গান অগনিত শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নিত। 

এতকিছুর পরেও কেন এমন প্রতিভার খুব অল্প বয়সে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল। যখন তার সংসার ছিল আর এতো ভালো গানের ক্যারিয়ার ছিল। তারপরও কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন তিনি, সেটা আজও সবার কাছে বিস্ময়ের।


ব্যাক্তিগত জীবন

তার জন্ম 1930 সালে হাওড়ার বালিতে। পান্নালাল 11 জন ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে ছোট। তিনি যখন সাত মাসের গর্ভে, তখন তার পিতা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মারা যান। যিনি একজন স্বনামধন্য পুরোহিত ছিলেন। তাই তাদের পরিবার ভক্তিরসে পরিপূর্ণ।

পিতৃ বিয়োগের পর দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কাছে পিতৃস্নেহে মানুষ হন পান্নালাল ভট্টাচার্য। শোনা যায় একবার যুবক বয়সে খেলতে খেলতে চোখে আঘাত পান পান্নালাল। সে সময়ে তাকে সুস্থ করার জন্য দাদার ভূমিকা ছিল অসীম। 

ফুটবল খেলার নেশা ছিল তাঁর অপরিসীম। মোহনবাগান হেরে গেলে তিনি নাকি তার রেকর্ডিং বা গানের কোন কাজকর্ম থাকলে সেটাকে বন্ধ করে দিতেন। তিনি মাছ ধরতে খুব ভালবাসতেন। ঘুড়ি ওড়াতেও পারতেন। আর দাদার মতো ভঙ্গিতে ধুতি পড়তেন। কারণ মনে মনে দাদাকে খুব ভক্তি করতেন।







অবিস্মরণীয় কিছু ঘটনা 

শোনা যায় একবার একটি সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত শ্যামা সংগীত শিল্পী "কে মল্লিক" পান্নালাল ভট্টাচার্য কে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেলেছিলেন। আর বলেছিলেন "তুই কি করে এমন ভাবে মাকে ডাকতে পারিস"। এই কথা শুনে সেখানে উপস্থিত প্রত্যেকে সেদিন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন, একজন জহুরী আসল জহর কিভাবে খুঁজে পেয়েছেন।

এ রকমই আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। সংগীতের অনুষ্ঠান সেরে ট্রেনে করে ফিরছেন পান্নালাল ভট্টাচার্য এবং অন্যান্য শিল্পীরা। বালিতে নামার আগে পান্নালাল বলে উঠলেন আজকে মাকে তুঁতে রং এর শাড়ি পড়ানো হয়েছে। এই শুনে সবাই এর সত্যতা প্রমাণের জন্য ট্রেন থেকে নেমে সোজা মন্দিরে যান। 

আর সেখানে গিয়ে সবাই অবাক হয়ে যান। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল। মায়ের তুঁতে রঙের বেশ দেখে সবাই চমকে যান। এরকমই নানান অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে তার জীবনে বহুবার। 

কিন্তু তার আক্ষেপ ছিল তিনি মায়ের দর্শন পায়নি কোনদিন। প্রতি কালীপুজোয় তিনি তার দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের সাথে দক্ষিণেশ্বর যেতেন এবং সারারাত পূজার অনুষ্ঠানে কাটাতেন। এতটাই ভক্তি ছিল তার মনে মায়ের প্রতি। 



জীবনের পথ পরিবর্তিত

সংসার প্রিয় মানুষটি সংসার ভুলে মাঝেমধ্যেই নাকি শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন আর অঝর নয়নে কাঁদতেন। মনে মনে মাকে ডাকতেন। কেন তিনি এমনটি করতেন তাঁর প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হয়নি। 

যত দিন গেছে ততো এই ভাব তাঁর মধ্যে বেশি বেশি করে প্রকাশিত হয়েছে। শোনা যায় মাতৃদর্শনই নাকি একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছিল জীবনের শেষের দিকে।



তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি

মা কালীর অশেষ কৃপা বলে এবং তার ভক্তি বলে পান্নালাল ভট্টাচার্য অনবদ্য সব শ্যামা সঙ্গীত উপহার দিয়েছেন অগণিত শ্রোতাদের। তাঁর এই সংগীত চির অমর হয়ে রয়েছে আজও এবং তাকে একটি উচ্চ স্থান দিয়েছে সবার হৃদয়ে।

তিনি 36 টি আধুনিক গান সমেত 18টি রেকর্ড করেছেন জীবনে। তিনটি ছবিতে গান গেয়েছেন এবং 40 টি শ্যামা সংগীত এর রেকর্ড করেছেন। ছদ্মনাম দিয়ে তিনি শ্যামা সংগীত রচনা করেছেন এবং তাতে সুর দিয়েছেন। ছদ্মনামটি ছিল "শ্রী অভয়"।



আত্মহত্যা করলেন পান্নালাল ভট্টাচার্য  

1966 সালে দাদার সুরে গান করলেন "অপার সংসার নাহি পারাপার"। আর এই বছরেই মাত্র 36 বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করলেন। সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন গায়ক রুপি মাতৃ সাধক। 

এতো সংসার প্রিয় মানুষটি কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন তা আজও মানুষের কাছে বিস্ময়ের। মায়ের হয়তো তেমনই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এই স্বল্প সময়ে তিনি শ্রোতাদের যে উপহার দিয়ে গেলেন তা ভুলবার নয়। 

আজীবন তার এই সংগীতপ্রতিভা কে মানুষ মনের মণিকোঠায় জায়গা দিল। আজও তাই শ্যামা মায়ের পুজোয় কাঁসর, ঢাকের সঙ্গে তার গানগুলিও বিদ্যমান। তিনি আজীবন আমাদের হৃদয়ে জীবিত আছেন।



আপনার মূল্যবান মতামত জানান

আপনি শ্যামাসংগীত শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্যের কোন গানটি বেশি শুনতে পছন্দ করেন। তাঁর গান ছাড়া কি সত্যিই কালি পূজো অপূর্ণ থাকবে। আমাদের লিখে জানান আপনার উত্তর। 

কেমন লাগছে আমাদের লেখা পড়তে। আর কি বিষয়ে জানতে চান লিখে জানান।

এছাড়াও আমাদের ইউটিউব চ্যানেল মন জংশন এ ঘুরে আসতে পারেন আরো পুরাতনী তথ্য জানার জন্য, ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ