মিঠুন চক্রবর্তীর জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত প্রথম ছবি মৃগয়া (Mithun Chakraborty first movie)

মিঠুন_চক্রবর্তীর_জাতীয়_পুরস্কার
Picture source: mrinalsen.org

মিঠুন চক্রবর্তীর জাতীয় পুরস্কার


তিনি সাফল্য খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আর সাফল্য (success) তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কি অদ্ভুত মুহূর্ত। 

জীবনের প্রথম কাজ, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, মৃণাল সেন এর সাথে কাজের সুযোগ আর জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার শুরু। এ সবই ঈশ্বর তার জন্য জোগাড় করে রেখেছেন সযত্নে। ওদিকে তিনি মুম্বাইয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য।

তারপর এলো সেই মুহূর্ত (golden opportunity) যার জন্য গৌরাঙ্গ চক্রবর্তী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন। না তখনও তিনি মিঠুন হয়ে উঠতে পারেননি। গৌরাঙ্গের সঙ্গে দেখা হলো পরিচালক মৃণাল সেনের আর রচনা হল গৌরাঙ্গের জীবনের ঐতিহাসিক অধ্যায়। শুটিং শুরু হলো "মৃগয়া" র।


মৃগয়া - র গল্প :


গল্পটি 1930 সালের আদিবাসীদের দুঃখ-দুর্দশার উপরে নির্মিত। দেখানো হয়েছে উড়িষ্যার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম যেখানে কিছু উপজাতি বসবাস করেন। তাদের হিংস্র বন্য প্রাণীর সাথে বসবাস করতে হয়। যারা সব সময় তাদের তৈরি করা ফশল নষ্ট করতে থাকে। তবে ফসল নষ্টকারী প্রাণীদের সমস্যা ছাড়াও লোভী মহাজন' এবং পুলিশ ইনফর্মারদের সমস্যা ছিল প্রবল। 

এই গ্রামে একজন ব্রিটিশ প্রশাসক উপস্থিত হন এবং তিনি ঘিনুয়ার সাথে বন্ধুত্ব করেন। ঘিনুয়া অর্থাৎ মিঠুন চক্রবর্তী খুব ভালো মাপের একজন ধনুর্বিদ (exceptional archer)। তার সাথে এই নতুন ব্রিটিশ প্রশাসক - র বন্ধুত্ব হয়। কারণ তিনি একজন শিকার প্রেমি ছিলেন।

এরপর দেখা যায় সুলুক নামে একটি তরুণ বিপ্লবী এই গ্রামে তার মায়ের সাথে দেখা করতে আসলে বিষয়টি জানাজানি হয় এবং পুলিশ খবর পেয়ে তার সন্ধান করতে থাকে।

এরপর শাস্তি দেওয়ার জন্য পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে হঠাৎ গ্রামে ডাকাতির ঘটনা ঘটে আর একজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়।

এই ডাকাতির দোষ গিয়ে পড়ে সুলুক এর ওপর। এই সুযোগটি গ্রহণ করে একজন পুলিশ ইনফর্মার। সে সুলুককে হত্যা করে আর পুরস্কার দাবি করে।

এদিকে দুংরী অর্থাৎ মমতা শংকর একজন মহাজনের হাতে অপহৃত হন। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য মহজন কে হত্যা করে ঘিনুয়া।

কিন্তু তার সাথী ব্রিটিশ প্রশাসক তাকে সেই অপরাধে মৃত্যুর সাজা শোনায়। তার ফাঁসি হয়। তবে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ঘিনুয়া বলতে থাকে কেন একই অপরাধে একজনের পুরস্কার প্রাপ্তি হবে আর অপরজন মৃত্যুবরণ করবে।


কিভাবে সাক্ষাৎ হলো দুজনের :


সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয়টি হলো কিভাবে এই যুগল অর্থাৎ মিঠুন চক্রবর্তী এবং মৃণাল সেন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হলেন। মিঠুন যখন তার যোগ্যতা প্রমাণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অভিনয়টা খুব ভালোভাবে রপ্ত করবেন।

তাই খুব ভালোভাবে শেখার জন্য পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে 4 বছরের একটি কোর্স (course) করেন এবং তাতে প্রথম হন। সেখানে একটি পরীক্ষায় মৃণাল সেন বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং মিঠুনের অভিনয় দেখে তিনি মুগ্ধ হন।





সিনেমা তৈরির সিদ্ধান্ত :


এর বেশ কিছু দিন পর মৃণাল সেন একটি সিনেমা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনাটি আদিবাসীদের নিয়ে আর সেখানে একজন গায়ের রং চাপা এবং বলিষ্ঠ চেহারার অভিনেতার প্রয়োজন হয়। 

আর সে সময় মিঠুনের কথা মনে পড়ে পরিচালক মৃণাল সেনের। কিন্তু কিছুতেই তিনি মিঠুনের নাম মনে করতে পারছিলেন না। তখন তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট এর সাথে যোগাযোগ করেন এবং মিঠুনের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করেন।

পরিচালকের কথামতো তার সহকারী মিঠুনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন এবং জানান পরিচালক মৃণাল সেন তাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তার একটি মেকআপ ছাড়া ফটো পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু মিঠুন সরাসরি মৃণাল সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার বাড়িতে চলে যান।


সাক্ষাৎ :


এখানে ফিল্ম স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা হয়। মিঠুন প্রথম সিনেমা হিসেবে একটি অ্যাকশন এবং ড্রামায় পরিপূর্ণ স্ক্রিপ্ট কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী একটি গল্প (story) ছিল।

মিঠুন কিছুটা হতাশ হয়ে যান। এটা বুঝতে পারেন পরিচালক মৃণাল সেন। তিনি মিঠুনকে বলেছিলেন তিনি যেন আক্ষেপ না করেন। তিনি যা বলছেন তার কথা মত চললে তাকে দর্শকরা মনে রাখবেন।


জাতীয় পুরস্কার :


একেই বলে মহান মানুষের মূল্যবান উক্তি। মৃণাল সেনের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিলো। গৌরাঙ্গ "মিঠুন চক্রবর্তী" হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারলেন জীবনের প্রথম ছবির মাধ্যমে। যেটি তাকে জাতীয় পুরস্কার এনে দিল।

তবে আসল কথা হলো সাফল্য একদিনে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই মিঠুনকে ততোধিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল যা করে জীবনে পর্যাপ্ত সফলতা অর্জন করা সম্ভব। তার ছিল প্রচন্ড ডেডিকেশন কাজের প্রতি।


কাজের প্রতি :


তিনি আদিবাসীদের সাথে দিন কাটিয়েছেন। তাদেরকে আরো কাছের থেকে বুঝেছেন। আরো বেশি করে জেনেছেন তাদের জীবনযাত্রা (lifestyle) সম্পর্কে আর সেই কারণেই তিনি আদিবাসীর জীবনযাত্রাকে নিখুত ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।

ডেডিকেশন তার কাজের প্রতি ছিল বলেই তিনি জীবনের প্রথম (first) কাজেই এত সফলতা অর্জন করেছেন।


ছবিটি সম্পর্কে বিস্তারিত :


মৃগয়া ছায়াছবিটির পরিচালক মৃণাল সেন। প্রযোজক কে রাজেশ্বর রাও। লিখেছেন মোহিত চট্টোপাধ্যায় এবং অরুণ কল। 6ই জুন 1976 এ ছবিটি মুক্তি পায়।

মিঠুন চক্রবর্তী এবং মমতা শঙ্কর দুজনেরই সিনেমা জগতে পদার্পণ ছবিটির হাত ধরে। ছবিটিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন সলিল চৌধুরী। সিনেমাটোগ্রাফি পরিচালনা করেছেন কে কে মহাজন।

পুরস্কার ও সম্মান :


ভারতের 24 তম জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে মৃগয়া দুটি পুরস্কার জিতেছিল। সেরা ফিচার ফিল্ম এবং সেরা অভিনেতার জন্য। এছাড়াও মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত হয়েছিল গোল্ডেন প্রাইজের জন্য। 1977 সালে সেরা চলচ্চিত্রের ফিল্মফেয়ার সমালোচকদের পুরস্কারও অর্জন করেছিল।

ছায়াছবিটি মাঝারি মানের অর্থ উপার্জন (earning) করতে সক্ষম হয়েছিল এবং ক্রিটিক্স ও দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেতে সমর্থ হয়েছিল।


আপনার কাছে জানতে চাই :


এবার আপনার কাছে প্রশ্ন। আপনি কি মৃগয়া ছায়াছবিটি দেখেছেন? যদি দেখে থাকেন তাহলে আপনার প্রতিক্রিয়া কি আমাদের লিখে জানান। সাথে এটিও জানান মিঠুন চক্রবর্তীর উপস্থিতি আপনাকে কতটা প্রভাবিত করেছে। 

আপনার উত্তরের আশায় অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

এছাড়াও আমাদের ইউটিউব চ্যানেল মন জংশন এ ঘুরে আসতে পারেন আরো পুরাতনী তথ্য জানার জন্য, ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ